উপরোক্ত বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণীজন বক্তব্য দিয়েছেন। তার মধ্যে আমাদের দেশে একটি মতবাদের প্রতি জোর দেয়া হয়। এক্ষেত্রে তিনটি ক্ষেত্র বা ডোমেইন নিয়ে আলোচনা হয়।
১. বুদ্ধিবৃত্তীয় বা জ্ঞানগত ক্ষেত্র(Cognitive Domain )
২. আবেগীয় ( Affective Domain)
৩.মনোপেশিজ ( Psychomotor Domain)
১. বুদ্ধিবৃত্তীয়ঃ
এ ক্ষেত্রটি চিন্তন এর সাথে সম্পর্কীত এবং বুদ্ধি ভিত্তিক প্রক্রিয়ায় সাথে যুক্ত। চিন্তা করা, বুদ্ধি বা কৌশল খাটানো,বুদ্ধির সামর্থ,দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদির বিকাশ নিয়ে আলোচনা। এ ডোমেইনের কতগুলো স্তর আছে, যেমনঃ
ক)জ্ঞান মূলকঃ
নতুন কিছু জানা,যেমনঃ ইলিশ একটি মাছের নাম, জাপানের রাজধানীর নাম টোকিও ইত্যাদি। যাকে আমরা বলি জ্ঞান মূলক বিষয়।
খ)অনুধাবন মূলকঃ
কোন কিছু বুঝতে পারা, যেমনঃ কোনটা গরু আর কোনটা মহিষ তা দেখে বুঝতে পারে । হতে পারে এমন, কোন শিশুকে একটি গরু দেখানো হল, এখন একটি মহিষ দেখিয়ে প্রশ্ন করা হলো, এটা কি গরু? তখন সে তার বু্দ্ধি প্রয়োগ করে,যাচাই করে উত্তর দিবে, না এটা তো গরু নয়, অন্য কিছু। আবার শিক্ষার্থী (১) গরুর উপকারিতা ব্যাখ্যা করতে পারবে। এ ধরনের বিষয়কে আমরা বলি অনুধাবন করতে পারা।
গ)প্রয়োগঃ
বৃষ্টি, বর্ষাকাল, নদনদী সম্পর্কে শ্রেণি কক্ষে আলোচনা হলো, আবার পলাশীর যুদ্ধের কাহিনী শিক্ষক শ্রেণি কক্ষে উপস্থাপন করলেন। ফলে শিক্ষার্থীরা (১)বন্যা হওয়ার কারন বলতে পারবে (২) পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের কারন লিখতে পারবে।ফলে, শিক্ষার্থীরা, "অর্জিত জ্ঞান ও অনুধাবন, নীতি, সূত্র, কোন ধারণা,তত্ত্ব ইত্যাদি " নতুন পরিস্থিতিতে বা বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারল। এ বিষয়টিকে বলা হয় প্রয়োগ।
ঘ) বিশ্লেষণঃ
অর্জিত জ্ঞান ও অনুধাবন, নীতি, সূত্র, কোন ধারণা,তত্ত্ব ইত্যাদি নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে কোন পরিস্থিতি বা ঘটনা ব্যাখ্যা করার পর, তা উপস্থাপন করতে পারা। অথবা, কোন সমগ্র বস্তুকে ভেঙে তাকে বিভিন্ন অংশে পৃথক করার পর উহা আলাদা আলাদা ভাবে উপস্থাপন বা বর্ননা করার ক্ষমতা। যেমনঃ (১)পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের কারন গুলো লিখতে পারা, (২)পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফরের ভূমিকা বর্ণনা করা ইত্যাদি, এ বিষয়টিকে বলা হয় বিশ্লেষণ।
ঙ)সংশ্লেষণঃ
অর্জিত জ্ঞান ও অনুধাবন, নীতি, সূত্র, কোন ধারণা,তত্ত্ব ইত্যাদি নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে কোন পরিস্থিতি বা ঘটনা ব্যাখ্যা করার পর, একক সারসংক্ষেপ তৈরী করা অথবা, বিভিন্ন উপাদান বা অংশকে একত্রিত করে পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরী করা। যেমনঃ (১) কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত,সুস্থতা,মৃত ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্ব-মানচিত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমনের তুলনামূলক চিত্র তৈরী করতে পারা। এ বিষয়টিকে বলা হয় সংশ্লেষণ।
চ)মূল্যায়ণঃ
অর্জিত জ্ঞান ও অনুধাবন, নীতি, সূত্র, কোন ধারণা,তত্ত্ব ইত্যাদি নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে কোন পরিস্থিতি বা ঘটনা ব্যাখ্যা করার পর, একক সারসংক্ষেপ তৈরী করা অথবা, বিভিন্ন উপাদান বা অংশকে একত্রিত করে পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরী করার পর কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারা। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটা বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয়। যেমনঃ (১) বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে অর্থনৈতিক অবস্থার কী কী ক্ষতি হতে পারে, লিখুন। অথবা, (২) রচনামূলক ও নৈব্যক্তিক প্রশ্নের মধ্যে কোনটি উত্তম তা বিচার করা। এ বিষয়টিকে বলা হয় মূল্যয়ণ।
২. আবেগীয় ক্ষেত্র
এই ক্ষেত্রটিতে মূলতঃ আগ্রহ,দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং যথাযথ গুণ বিচারকরণ ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে। এর পাঁচটি উপবিভাগ আছে,
ক) গ্রহণঃ
গ্রহণ বলতে বোঝায় শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে আদান-প্রদান, বা প্রশ্ন-উত্তর শুনবে ও এর প্রতি মনোযোগী হবে। শিক্ষক কী কী করছেন তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি থাকবে ও বলতে পারবে।
খ) সাড়া প্রদানঃ
এটা হল উত্তর প্রদান বা প্রতিক্রিয়া করা। শিক্ষার্থী কোন কোন উদ্দীপক বা বিষয়ের প্রতি প্রতিক্রিয়া করতে চায় তা তার(শিক্ষার্থীর) আগ্রহ ও প্রেষণার প্রতিফলন। উল্লেখ্য, এ থেকে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসিক যোগ্যতা বা অবচেতন ইচ্ছা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন।
গ)মূল্যবোধ নিরুপনঃ
এই শ্রেণির উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত নিজস্ব মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন থাকে। যেমনঃ শিক্ষার্থী "অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনকে", সমর্থন করবে।
ঘ)সংগঠিত করণঃ
যখন কোন শিক্ষার্থীর মধ্যে একাধিক মূল্যবোধ বা দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ বা বিকাশ ঘটে । তখন সে(শিক্ষার্থী) তার দৃষ্টভঙ্গী বা মূল্যবোধ সমূহ কে একটি বিশেষ রীতিতে বিন্যাসের চেষ্টা করে যাতে স্ববিরোধী ভাবনা বা তার আচরনের অসাম্ঞ্জস্যতা দূর হয়। উদাহরনঃ যে কোন একজন জনন্দিত নেতার বা কোন ব্যক্তির বৈশিষ্ট নিরুপন করতে পারা।
ঙ) মূল্যবোধ দ্বারা চারিত্রিক বৈশিষ্ট প্রদর্শনঃ
এই শ্রেণিটি হলো অনুভূতিমূলক ডোমেইনের সবচেয়ে উঁচু স্তরের উদ্দেশ্য। এই স্তরে ব্যক্তির চরিত্র বর্ননা করতে নিয়ন্ত্রিত মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গী ,আচরণ, আদর্শ ও বিশ্বাসের বিবেচনা করা হয়। নিয়ন্ত্রিত মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গী ,আচরণ, আদর্শ ও বিশ্বাসের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ব্যক্তির সামগ্রিক জীবন-দর্শন ফুটে উঠে।
উদাহরণঃ শিক্ষার্থী তার জীবন দর্শনের পরিবর্তন করতে পারবে।
৩. মনোপেশীজ ক্ষেত্র
এই ক্ষেত্রটিতে মূলত মন ও পেশী দক্ষতাকে তাদের বিষয়বস্তু হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে । সুনিপুন ভাবে বা মন-পেশি শক্তি দিয়ে কাজ করার যোগ্যতা যাতে নির্ভুলতা,স্বচ্ছতা,যথার্থতা,ধারাবাহিকতা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এর পাঁচটি উপবিভাগ আছেঃ
ক)অনুকরণঃ
শিক্ষার্থী কোন ক্রিয়া বা কাজের অনুকরণ করতে পারে।
খ)নিপুনতার সহিত পরিচালনাঃ
কোন কাজকে সুনিপুনভাবে পরিচালনা,পৃথকীকরণ,উপযুক্ত কর্ম নির্বাচন ইত্যাদি করতে পারা। যেমনঃ জটিল অনুবীক্ষণ যন্ত্র পরিচালনা করা।
গ)সঠিকতাঃ
কোন কাজ সম্পাদনে সঠিকতা,নির্ভুলতা ও যথার্থতা ঠিক রাখা।
ঘ)সমন্বয় সাধনঃ
বিভিন্ন কাজকে একত্র বা সংযোজন করে তাদের মধ্যে ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা।
ঙ)স্বভাবীকরণ/স্বভাবীভবনঃ
নূন্যতম মানসিক শক্তি ব্যায়ে কোন কাজ সম্পাদনের নিপুণতা বা কুশলতার সর্বোচ্চ স্তর অর্জন করার সামর্থ অর্জন। মূলত এ বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা অবচেতনভাবে হয়ে যায়। অর্থাৎ দক্ষতাটি স্বভাবের অংশ হয়ে যায়।
সংকলকের মন্তব্যঃ
শ্রেণি কক্ষে পাঠদান শেষে আমি-আপনি কখনো ভেবেছি যে, "উপরোক্ত উদ্দেশ্য সমূহ কতটা সফল? শিক্ষার্থীরা কী পেল? আর আমি কী কী দিয়েছিলাম"?
আসুন আমরা ভাবি....।
সংকলনে,
মুহাম্মদ সাঈদ উর রহমান
বি.এস-সি, বি.এড.
ICT4E District Ambassador, Munshiganj.
সহকারি শিক্ষক, আইসিটি।
পঞ্চসার দারুসসুন্নাত ইসলামিয়া ফাযিল(ডিগ্রী) মাদরাসা।
মুন্সীগঞ্জ সদর।
সূত্রঃ
১.সিপিডি,টিকিউআই,কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ক্লাশ, ঢাকা টিটিসি,ব্যানবেইজ।
২.শিখন, মূল্যযাচাই ও প্রতিফলনমূলক অনুশীলন-১, বাউবি, গাজিপুর।
৩. নিজস্ব কর্মসহায়ক গবেষণা।